
জমে উঠেছে ২০২৬ বিশ্বকাপে চলছে নকাউট পর্বের খেলা। এই বিশ্বকাপেই শেষ হচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের বেশ কিছু কিংবদন্তী খেলোয়াড়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। যার মধ্যে অন্যতম সর্বকালের সেরা ফুটবল তারকা আর্জেন্টাইন দলপতি লিওনেল মেসি। রয়েছেন ক্যারিয়ার জুড়ে ইঞ্জুরির সাথে লড়েও হার না মানা নেইমার জুনিয়র।
এছাড়াও রয়েছেন মাঠের পার্ফমেন্সকে উপেক্ষা করে নানা বিতর্কিত মন্তব্যের মাধ্যমে আলোচনায় থাকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। যেকিনা নিজেকে নিজেই সেরা দাবি করে!
চলুন কথা না বাড়িয়ে দেখে নেওয়া যাক ১০ জন তারকা ফুটবলার যারা এবার সম্বভ্য শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন।
লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)
২০২২ সালে ৩৫ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জয়ে স্বাদ পেয়েছেন লিও। সকলের ধারণা ছিল সেটাই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে ৩৯ বছর বয়সেই দিব্যি নিজের সেরাটা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। গড়ে যাচ্ছেন একের পর রেকর্ড। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৯টি গোলের মালিক এখন মেসি, সঙ্গে রয়েছে ৮টি অ্যাসিস্ট। চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত করেছেন ৬ গোল। ক্যারিয়ারের এমন পড়ন্ত বেলায় এসেও তার এমন অতিমানবীর পার্ফমেন্সেই বোঝা যায় তিনি কতটা অসাধারণ একজন খেলোয়াড়।
তিনি টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েছেন।
২০১৪ সালে আর্জেন্টিনা ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে গেলেও তিনি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতেছিলেন। ২০২২ সালে আবারও গোল্ডেন বল জিতে আর্জেন্টিনাকে ১৯৮৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন।
এটি তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ছাড়া আর কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড় এতবার বিশ্বকাপ খেলেননি। পরবর্তী ম্যাচটি হবে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর ৩০তম ম্যাচ এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২০০-এর বেশি ম্যাচ খেলার আরেকটি মাইলফলক।
২০৩০ সালের বিশ্বকাপে তাঁকে না দেখা নিঃসন্দেহে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক অন্যরকম অনুভূতি হবে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল)
বিশ্বকাপই একমাত্র বড় শিরোপা, যা এখনও রোনালদোর হাতে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ২৩১টি ম্যাচ ও ১৪৫টি গোলের মালিক ৪১ বছর বয়সী এই তারকা।
২০০৩ সালে পর্তুগালের হয়ে অভিষেকের পর ২০১৬ সালে ইউরো জিতলেও বিশ্বকাপে তাঁর সেরা সাফল্য এখনও ২০০৬ সালের সেমিফাইনাল।
চলতি বিশ্বকাপে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দুই গোল করার পর তিনি বলেছিলেন, “আই এ্যাম ব্যাক।” দীর্ঘ সময় ধরে পার্ফম করতে পারছেন না তিনি। ফলে এই ম্যাচে দুই গোল করে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। ফলে বার বার একই কথা বলে যাচ্ছিলেন। কিন্ত তার পরে ম্যাচেই আবাররো নিজের পুরোনো রূপে ফিরে যান। গোল শূন্য ড্র করে দার দল। ক্রমাগত বাজে পার্ফমেন্স আর বয়সের ভার দুই মিলিয়ে হয়তো এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ।
নেইমার (ব্রাজিল)
নেইমারের বিশ্বকাপ মানেই অনেকের মনে পড়ে ২০১৪ সালের সেই দুঃস্বপ্ন।
মাত্র ২২ বছর বয়সে পাঁচ ম্যাচে চার গোল করেছিলেন তিনি। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে পিঠের হাড় ভেঙে তাঁর বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়। এরপর সেমিফাইনালে ব্রাজিল জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়।
২০১৮ ও ২০২২ দুই বিশ্বকাপেই দুটি করে গোল করলেও ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেয়।
৩৪ বছর বয়সে চোট-আঘাতের সঙ্গে লড়াই করে এখনও তাঁর সামনে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বেঁচে আছে।
বিশ্বকাপে ১৪ ম্যাচে তাঁর অবদান ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট।
লুকা মদরিচ (ক্রোয়েশিয়া)
৪০ বছর ২৯১ দিন বয়সে বিশ্বকাপে অ্যাসিস্ট করা সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েছেন মদরিচ।
তাঁর সতীর্থ পেতার সুচিচ বলেন, “তিনি যেন ২০ বছরের তরুণের মতো খেলেন। তিনি অবিশ্বাস্য। তিনি আমাদের নেতা এবং সেরা খেলোয়াড়।”
গত দুই বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার সাফল্যই তাঁর প্রভাব বোঝায়।
২০১৮ সালে তারা সবাইকে চমকে দিয়ে ফাইনালে ওঠে। ২০২২ সালে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। বিশেষ করে ৩৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর ১২০ মিনিটের পারফরম্যান্স আজও স্মরণীয়।
মাত্র ৪০ লাখেরও কম জনসংখ্যার একটি দেশের এমন ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে মদরিচের অবদান অসামান্য।
তিনি পাঁচটি বিশ্বকাপে ২২টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে অভিষেক করেছিলেন। দেশের হয়েও খেলেছেন ২০০-এর বেশি ম্যাচ।
ম্যানুয়েল নয়ার (জার্মানি)
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স খুব ভালো না হলেও এ কারণেই জার্মান কোচ জুলিয়ান নাগেলসমান তাঁকে আন্তর্জাতিক অবসর ভেঙে ফিরিয়ে এনেছেন।
৪০ বছর বয়সী নয়ার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। ২০১৪ সালে জার্মানিকে বিশ্বকাপ জেতানোর পাশাপাশি গোল্ডেন গ্লাভও জিতেছিলেন।
এটি তাঁর পঞ্চম বিশ্বকাপ এবং ২০১০ সাল থেকে বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে খেলেছেন ২৩টি ম্যাচ।
যদিও এবার জার্মানি শেষ ৩২ থেকেই বিদায় নিয়েছে, তবুও ২০১৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী নয়ারের উত্তরাধিকার কখনোই মুছে যাবে না।
কেভিন ডি ব্রুইন (বেলজিয়াম)
বেলজিয়ামের তথাকথিত “গোল্ডেন জেনারেশন”-এর অন্যতম সেরা সদস্য ছিলেন ডি ব্রুইনে। কিন্তু সেই দলটি কখনোই প্রত্যাশামতো সাফল্য এনে দিতে পারেনি।
২০১৪ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৮ সালে সেমিফাইনাল এবং ২০২২ সালে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়।
৩৫ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার খেলছেন তাঁর চতুর্থ বিশ্বকাপ। ১৬ ম্যাচে করেছেন গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান।
ভার্জিল ভ্যান ডাইক (নেদারল্যান্ডস)
অনেকেই অবাক হবেন জেনে যে ভ্যান ডাইক বিশ্বকাপে খেলেছেন মাত্র আটটি ম্যাচ। কারণ ২০১৮ সালে নেদারল্যান্ডস বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি।
২০২২ সালে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় ডাচরা।
এবারও তিনি গোল দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে।
৩৪ বছর বয়সে এটি হয়তো তাঁর শেষ বিশ্বকাপ।
মোহাম্মদ সালাহ (মিশর)
৩৪ বছর বয়সী সালাহর এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ২০১৮ সালে পুরোপুরি ফিট না থাকলেও তিনি দুটি গোল করেছিলেন।
এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে তাঁর রেকর্ড ৫ ম্যাচে ৩ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট।
ধারণা করা হচ্ছে এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে।
সন হিউং-মিন (দক্ষিণ কোরিয়া)
দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৩ গোল এবং সর্বোচ্চ ১৩ ম্যাচ খেলার রেকর্ড এখন সনের দখলে।
তবে এবার তাঁর বিশ্বকাপ খুব একটা ভালো যায়নি।
গ্রুপ পর্বে তিনি কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি। এমনকি শেষ ম্যাচে শুরুর একাদশেও ছিলেন না।
তাঁর সেরা বিশ্বকাপ ছিল ২০১৮, যখন তিনি মেক্সিকো ও জার্মানির বিপক্ষে গোল করেছিলেন।
সদিও মানে (সেনেগাল)
২০১৮ সালের আগে ২০০২ সালের পর আর কোনো বিশ্বকাপে খেলেনি সেনেগাল।
মানের নেতৃত্বেই তারা টানা তিনটি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়।
২০১৮ সালে নিজের একমাত্র বিশ্বকাপ গোলটি করেন তিনি।
হাঁটুর চোটের কারণে ২০২২ বিশ্বকাপ মিস করলেও কাতারের টুর্নামেন্টে ওঠার প্লে-অফে মিশরের বিপক্ষে জয়সূচক পেনাল্টি তিনিই নিয়েছিলেন।
৩৪ বছর বয়সে সালাহর মতো মানের ক্ষেত্রেও ২০৩০ বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
সেনেগাল এখন শেষ ১৬-এ ওঠার লক্ষ্যে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে।
ক্রিফোস্পোর্টস/২জুলাই২৬/এনডি




















