
মাত্র ৯০ মিনিট। আর এই ৯০ মিনিটই বদলে দিয়েছে কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার জীবন।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্পেনের মতো শিরোপাপ্রত্যাশী দলের বিপক্ষে দুর্দান্ত গোলকিপিং করে ০-০ গোলের ড্র এনে দেন তিনি। ম্যাচ শেষে শুধু ফুটবল বিশ্বই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয় তাঁর উত্থান।
ম্যাচের আগে ইনস্টাগ্রামে ভোজিনহার অনুসারী ছিল মাত্র ৫০ হাজার। কিন্তু সেই এক ম্যাচের পর তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৪ লাখে (১৭.৪ মিলিয়ন)।
বিশ্বকাপে এমন হঠাৎ পাওয়া জনপ্রিয়তা অনেক খেলোয়াড়ের জন্য বিশাল আর্থিক সুযোগও তৈরি করে দেয়।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে মিডিয়া বিশেষজ্ঞ মাইক সেরাজিও বলছেন, এই ধরনের জনপ্রিয়তা যেমন খুব দ্রুত আসে, তেমনি দ্রুত হারিয়েও যেতে পারে।
তার ভাষায়,’এটি পুরোপুরি ভাইরাল হওয়ার বিষয়। খুব দ্রুত উপরে ওঠে, আবার খুব দ্রুত নিচেও নেমে যায়।’
অন্যদিকে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল মিডিয়া গবেষক ব্রুক ডাফি বলেন, যেসব ইনফ্লুয়েন্সারের কোটি কোটি অনুসারী রয়েছে, তারা একটি স্পন্সরড পোস্টের জন্যই ছয় অঙ্কেরও বেশি (এক লাখ ডলারের বেশি) পারিশ্রমিক দাবি করতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা বাড়লে ব্র্যান্ড পার্টনারশিপ, বিজ্ঞাপন এবং স্পন্সরড পোস্টের মাধ্যমে বিপুল আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
ডাফির ভাষায়, ‘বর্তমানে অনুসারীর সংখ্যাই এক ধরনের মুদ্রা। যত বেশি অনুসারী, সাধারণত আয়ের সম্ভাবনাও তত বেশি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে দিচ্ছে তারকা হওয়ার নতুন পথ
বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের ডিফেন্ডার টিম পেইনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তির আরেকটি উদাহরণ।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভ্যালেন স্কারসিনি তাঁকে “বিশ্বকাপের সবচেয়ে অজানা খেলোয়াড়” বলে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন এবং নিজের অনুসারীদের পেইনের অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করার আহ্বান জানান।
পেইনও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নেন। তিনি নিয়মিত পোস্ট করতে শুরু করেন এবং ওই ইনফ্লুয়েন্সারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী বেড়ে যায় প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬০ লাখে।
মজার বিষয় হলো, তাঁর অনুসারীর সংখ্যা এখন তাঁর নিজের দেশ নিউজিল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার (প্রায় ৫৩ লাখ) চেয়েও বেশি।
মাঠের পারফরম্যান্স ছাড়াও মিলছে খ্যাতি
ভোজিনহার জনপ্রিয়তা এসেছে অসাধারণ গোলকিপিংয়ের কারণে। কিন্তু টিম পেইনের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তিনি মাঠে অসাধারণ কিছু না করেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে কোটি মানুষের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
মাইক সেরাজিও বলেন, ‘গত পাঁচ থেকে দশ বছরে এমন অনেক ক্রীড়াতারকার উত্থান হয়েছে, যাদের জনপ্রিয়তা মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর। তাদের খ্যাতি অনেক সময় মাঠের পারফরম্যান্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
তিনি বলেন, অতীতে কোনো খেলোয়াড়কে টেলিভিশন বিজ্ঞাপন বা বড় ব্র্যান্ডের মুখ হতে হলে বিশ্বের সেরাদের একজন হতে হতো। কিন্তু এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে।
তার মতে, ‘আগের মতো মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর আর নির্ভর করতে হয় না। খেলোয়াড়রা এখন নিজেরাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অনুসারী বাড়াচ্ছেন, ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করছেন এবং জনপ্রিয়তাকে অর্থে রূপান্তর করছেন।’
বিশ্বকাপ শেষে কী থাকবে এই জনপ্রিয়তা?
সেরাজিওর মতে, এখন খেলাধুলার দর্শকসংস্কৃতি বদলে যাচ্ছে। পুরো ম্যাচে কেমন খেললেন, তার চেয়ে একটি ভাইরাল মুহূর্তই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন,’পুরো ম্যাচের পারফরম্যান্সের চেয়ে এমন একটি মুহূর্ত বেশি মূল্যবান, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে পারে।’
তার মতে, ‘এখন ভাইরাল মুহূর্তই সবচেয়ে বড় সম্পদ। অনেক সময় সেটি ম্যাচের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।’
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বকাপে হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা খেলোয়াড়রা কি এই খ্যাতিকে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারে রূপ দিতে পারবেন?
সেরাজিও বলেন, ‘তাদের হাতে খুব অল্প সময় থাকে। বিশ্বকাপের আগে কেউ কেপ ভার্দের গোলরক্ষককে চিনত না। আবার বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও হয়তো অনেকেই তাঁকে ভুলে যাবে।’
তবে লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো বিশ্বতারকাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা।
তিনি বলেন, ‘তারা অবসর নেওয়ার পরও বড় বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। কিন্তু যারা শুধু একটি ভাইরাল মুহূর্তের কারণে পরিচিত হন, তাদের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের উদাহরণ খুব বেশি নেই।’
ক্রিফোস্পোর্টস/২জুলাই২৬/এনডি




















