মাত্র কয়েক বছর আগেও সংসার চালাতে নিজের প্রিয় জিনিসগুলো একে একে বিক্রি করে দিতে হয়েছিল অরল্যান্ডো গিলকে। অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার খরচ জোগাতে তিনি বিক্রি করেছিলেন নিজের পোশাক, জুতা, এমনকি জাতীয় দলের হয়ে খেলার স্মৃতিবিজড়িত জার্সিও। সেই গিলই এখন বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় নায়ক। জার্মানির বিপক্ষে দুর্দান্ত গোলরক্ষণ করে দলকে শেষ ষোলোতে তুলে আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি।
গিলের কঠিন সময় শুরু হয় ২০২২ সালে। সে বছর তাঁর ছেলে লাওতারো দানিয়েলের জন্ম হয়। জন্মের পর থেকেই শিশুটি জটিল অসুস্থতায় ভুগছিল। চিকিৎসার ব্যয়, সংসারের খরচ এবং আর্থিক সংকট মিলিয়ে পরিবারটি চরম দুরবস্থার মধ্যে পড়ে। তখন গিল নিজের প্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিস বিক্রি করে দেন। এমনকি ২০১৯ সালে দক্ষিণ আমেরিকার অনূর্ধ্ব-২০ প্রতিযোগিতায় প্যারাগুয়ের হয়ে পরা জার্সিটিও বিক্রি করতে বাধ্য হন।
সেই সময় তিনি প্যারাগুয়ের একটি বয়সভিত্তিক দলে খেলতেন। জাতীয় দলে নিয়মিত খেলার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু পরিবারের প্রয়োজনের কাছে সেই স্বপ্নের স্মারকও ধরে রাখতে পারেননি। শুধু নিজের গোলরক্ষকের দস্তানাটি রেখে দিয়েছিলেন।
সেই দস্তানা পরেই জার্মানির বিপক্ষে নিজের জীবনের অন্যতম সেরা ম্যাচ খেলেছেন গিল। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে তিনি ছয়টি নিশ্চিত গোলের সুযোগ রুখে দেন। পরে খেলার ভাগ্য নির্ধারণী শটেও দুটি শট ঠেকিয়ে প্যারাগুয়েকে স্মরণীয় জয় এনে দেন। বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের নায়ক হয়ে যান তিনি।
লম্বা গড়নের কারণে আর্জেন্টিনার ফুটবলে গিলকে অনেকেই বেলজিয়ামের কিংবদন্তি গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়ার সঙ্গে তুলনা করেন। তবে শুরুতে তিনি গোলরক্ষক ছিলেন না। মাঠের মাঝখানে খেলতেন। পরে গোলবারের নিচে দাঁড়ানো শুরু করেন এবং সেখানেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। প্যারাগুয়ের কিংবদন্তি গোলরক্ষক হোসে লুই চিলাভার্টকে অনুসরণ করে তিনি স্থির বল থেকেও গোল করার অনুশীলন করতেন। দেশের ঘরোয়া ফুটবলে তাঁর নামে চারটি গোলও রয়েছে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে তাঁর জীবনে নতুন মোড় আসে। প্যারাগুয়ে ছেড়ে আর্জেন্টিনার সান লরেঞ্জো ক্লাবে যোগ দেন। প্রথমে বয়সভিত্তিক দলে খেললেও পরে মূল দলে সুযোগ পান। ধারাবাহিক ভালো খেলায় দ্রুত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর জাতীয় দলেও ডাক পান এবং অল্প সময়ের মধ্যেই প্যারাগুয়ের অন্যতম ভরসার গোলরক্ষকে পরিণত হন।
গিলের কঠিন সময়ের কথা গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন তাঁর স্ত্রী মেলিসা। তিনি লিখেছিলেন, ছেলের জন্মের সময় তাঁদের কাছে কিছুই ছিল না। সংসার চালাতে অরল্যান্ডো নিজের পোশাক, জুতা এবং জাতীয় দলের জার্সিও বিক্রি করেছিলেন। সেই কঠিন সময় পার হয়ে আজ তিনি দেশের মানুষের গর্ব।
জার্মানির বিপক্ষে জয় নিশ্চিত হওয়ার পরও গিল ছিলেন শান্ত। পরে তিনি জানান, এই জয় তিনি উৎসর্গ করছেন তাঁর অসুস্থ ভাতিজাকে, যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভাতিজা দ্রুত সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরে আসবে।
গিলকে নিয়ে আগে একটি সমালোচনা ছিল। অনেকেই বলতেন, তিনি মাঠে সতীর্থদের সঙ্গে খুব কম কথা বলেন। তবে জার্মানির বিপক্ষে তাঁর পারফরম্যান্সের পর সেই আলোচনা অনেকটাই থেমে গেছে। নিজের দক্ষতা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, বড় ম্যাচে কাজই একজন খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
ক্রিফোস্পোর্টস/১জুলাই২৬/টিএ



