শেষ মুহূর্তের গোল, রেফারিং বিতর্ক, অবিশ্বাস্য অঘটন এবং দুটি রোমাঞ্চকর পেনাল্টি শুটআউট—গতকালের ম্যাচগুলো যেন বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্যই তুলে ধরেছে। ইউরোপের শক্তিশালী দল জার্মানিকে হারিয়ে প্যারাগুয়ে দিনের সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিল শেষ মুহূর্তে গোল করে জাপানের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে, আর মরক্কো পেনাল্টি শুটআউটে নেদারল্যান্ডসকে বিদায় করেছে।
আজকের ম্যাচগুলো যদি গতকালের মতোই নাটকীয় হয়, তাহলে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও এক স্মরণীয় দিন। মাঠে নামবেন বিশ্বের দুই বড় তারকা—ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। এছাড়া যৌথ আয়োজক মেক্সিকোও ইকুয়েডরের বিপক্ষে জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে।
তবে আলোচনার মূল বিষয় কেন ফ্রান্সকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম শীর্ষ ফেবারিট ধরা হচ্ছে?
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই অনেক বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সকে শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। টুর্নামেন্টে তাদের পারফরম্যান্স সেই ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করেছে।
এর প্রধান কারণ হলো তাদের অসাধারণ ভারসাম্যপূর্ণ দল। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপের ৪৮টি দলের মধ্যে কাগজে-কলমে সবচেয়ে শক্তিশালী স্কোয়াডগুলোর একটি ফ্রান্সের। শুধু তারকাখচিত আক্রমণভাগ নয়, দলের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই রয়েছে অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার দুর্দান্ত সমন্বয়।
আজ সুইডেনের বিপক্ষে যে একাদশই মাঠে নামুক না কেন, রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠে থাকবেন এমন অনেক খেলোয়াড়, যারা নিজেদের ক্লাবের হয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ঘরোয়া লিগ শিরোপা জিতেছেন। তবে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে তাদের আক্রমণভাগ।
এমবাপ্পে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় অস্ত্র
রিয়াল মাদ্রিদের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। ক্লাব ফুটবলে যেমন তিনি দুর্দান্ত, আন্তর্জাতিক ফুটবলেও তার প্রভাব আরও বেশি।
এ পর্যন্ত দুটি বিশ্বকাপে খেলেই তিনি একবার চ্যাম্পিয়ন এবং একবার রানার্স-আপ হয়েছেন। মাত্র ১৭টি বিশ্বকাপ ম্যাচে তার গোল সংখ্যা ১৬। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও তার দখলে যেতে পারে।
তার অসাধারণ গতি, নিখুঁত ফিনিশিং এবং বড় ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করার ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তবে প্রতিপক্ষ শুধু এমবাপ্পেকে থামালেই হবে না।
তারকায় ভরা আক্রমণভাগ
এমবাপ্পের পাশে আছেন উসমান দেম্বেলে, যিনি বর্তমানে ব্যালন ডি’অর বিজয়ী। বিশ্বের সেরা ফুটবলারের এই পুরস্কার জয়ের পাশাপাশি তিনি ফ্রান্সের সর্বশেষ ম্যাচে মাত্র আধা ঘন্টার কিছু বেশি সময়ে হ্যাটট্রিক করেছেন। এছাড়া ক্লাব পর্যায়ে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইকে টানা দুই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এছাড়াও ফ্রান্সের আক্রমণভাগে রয়েছেন দেজিরে দুয়ে, রায়ান শেরকি, ব্র্যাডলি বারকোলা এবং মাইকেল অলিসের মতো প্রতিভাবান ফুটবলাররা। এদের প্রত্যেকেই বিশ্বের প্রায় যেকোনো জাতীয় দলের মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার মতো মানের খেলোয়াড়।
ডিডিয়ের দেশমের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব
এই তারকাখচিত দলকে সফলভাবে পরিচালনা করছেন কোচ ডিডিয়ের দেশম। ২০১৮ সালে তার অধীনেই ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতেছিল। শুধু কোচ হিসেবেই নয়, ১৯৯৮ সালে খেলোয়াড় হিসেবেও তিনি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, কৌশলগত দক্ষতা এবং বড় টুর্নামেন্টে চাপ সামলানোর ক্ষমতা ফ্রান্সকে আরও ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ করে তুলেছে। জানা গেছে, এটিই দেশমের শেষ বিশ্বকাপ কোচ হিসেবে, তাই দলকে শিরোপা জিতিয়ে বিদায় নেওয়ার বাড়তি প্রেরণাও রয়েছে তার।
কোনো দুর্বলতা কি আছে?
ফ্রান্সের একমাত্র তুলনামূলক দুর্বলতা হিসেবে গোলকিপিং বিভাগের কথা বলা হয়। প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও, তিনি ইতালির শীর্ষ ক্লাব এসি মিলানের নিয়মিত গোলরক্ষক। ফলে এই “দুর্বলতা”ও অন্য অনেক দলের কাছে ঈর্ষণীয় শক্তি।
তাহলে কি কেউ ফ্রান্সকে থামাতে পারবে?
কাগজে-কলমে বিচার করলে ফ্রান্সকে হারানো কঠিন বলেই মনে হয়। তবে বিশ্বকাপ বারবার প্রমাণ করেছে, ফুটবল কখনোই শুধু কাগজে-কলমে খেলা হয় না। মাঠের ৯০ মিনিটেই তৈরি হয় ইতিহাস, আর সেখানেই জন্ম নেয় অপ্রত্যাশিত সব চমক। তাই ফ্রান্স যতই শক্তিশালী হোক, বিশ্বকাপের মঞ্চে কোনো ফলই আগে থেকে নিশ্চিত নয়।
ক্রিফোস্পোর্টস/১জুলাই২৬/এনডি



