Connect with us
ফুটবল

রিয়ালে সুপারস্টার, জাতীয় দলে প্রশ্নবিদ্ধ

ভিনিসিয়ুস কি পারবেন গোটা ব্রাজিলের হৃদয় জিততে?

Vini Junior
রিয়ালের জার্সিতে উজ্জ্বল ভিনি, ব্রাজিলের জার্সিতে বিবর্ণ!

মে মাসের শেষদিকে পানামার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলন প্রায় শেষের দিকে। ঠিক তখনই ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি অত্যন্ত সংযত ও মার্জিত ভঙ্গিতে এমন এক প্রসঙ্গ তুললেন, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।

তিনি বলেছিলেন, “অনেকে বলে, বর্তমান ব্রাজিল দলে কোনো প্রকৃত সুপারস্টার নেই। হয়তো কথাটা পুরোপুরি ভুল নয়, “আমাদের দলে এখন পেলে নেই, রোমারিও নেই, রোনালদোও নেই। কিন্তু আমাদের আছে সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। আর কখনও কখনও সেটাই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।”

একসময় ধারণা করা হয়েছিল, রিয়াল মাদ্রিদের উজ্জ্বল নক্ষত্র ভিনিসিয়ুস জুনিয়রই হবেন ব্রাজিলের নতুন মুখ, নতুন নেতৃত্বের প্রতীক। কিন্তু সময় গড়িয়েছে, চার বছর পেরিয়ে গেছে কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে বিদায়ের পরও—তবু ২৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে ঘিরে সংশয় কাটেনি।



পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মার্চে ফ্রান্সের কাছে ২-১ গোলে হারের পর ব্রাজিলের ফুটবল অঙ্গনে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—ভিনিসিয়ুসের কি আদৌ শুরুর একাদশে থাকা উচিত?

দেশটির জনপ্রিয় ফুটবল ভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠান লিনহা দি পাসে (Linha de Passe) সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিল—“ভিনিসিয়ুসকে কি বেঞ্চে বসানো উচিত?”

এমনকি আনচেলত্তির মতো কোচের আগমনও এই প্রশ্নকে থামাতে পারেনি। অথচ ক্লাব ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করা কোচদের একজন তিনি। কিন্তু জাতীয় দলে ভিনিসিয়ুসের গল্পের সঙ্গে জুড়ে থাকা প্রশ্নটি এখনও রয়ে গেছে—

“রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুসকে ব্রাজিলের জার্সিতে দেখা যায় না কেন?”

বর্তমান বিশ্বকাপ চক্রে ব্রাজিলের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল ও অ্যাসিস্টে অবদান রাখা খেলোয়াড় ভিনিসিয়ুসই। কিন্তু পরিসংখ্যানও খুব একটা চমকপ্রদ নয়—২৮ ম্যাচে ৭ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট।

ব্রাজিলের সাবেক সহকারী কোচ ক্লেবার জাভিয়ের বলেন, “ক্লাবের মতো একই মানের ফুটবল জাতীয় দলে খেলাটা খুব কঠিন। বাইরে থেকে ব্যাপারটা যত সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। ক্লাবে প্রতিদিন একসঙ্গে অনুশীলন হয়, নির্দিষ্ট কৌশল থাকে, পরিচিত সতীর্থ থাকে। সময়ের সঙ্গে বোঝাপড়া গড়ে ওঠে। জাতীয় দলে সেই সুযোগ সীমিত।”

উদাহরণ হিসেবে তিনি লিওনেল মেসির কথাও টানেন। “মেসিকেও দীর্ঘদিন একই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি ক্লাবের মতো খেলতে পারেন না—এমন সমালোচনা শুনেছেন বছরের পর বছর। কিন্তু ২০২২ সালে এসে সব বদলে যায়। কারণ তখন আর্জেন্টিনা একটি সুসংগঠিত দল হয়ে উঠেছিল।”

সমালোচনা থেকে কখনও পালাননি ভিনিসিয়ুস

ভিনিসিয়ুস নিজেও বিষয়টি এড়িয়ে যান না। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ক্লাবে প্রতি তিন দিন পরপরই নতুন ম্যাচ থাকে। দশ ম্যাচের মধ্যে দুই ম্যাচ খারাপ খেললে সেটা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। কিন্তু জাতীয় দলে এক ম্যাচ থেকে আরেক ম্যাচের ব্যবধান অনেক দীর্ঘ। তাই প্রতিটি ম্যাচই আলাদা গুরুত্ব পায়। সবাই চায় আমি সবসময় সেরা পারফরম্যান্স দিই।”

হাসতে হাসতেই তিনি যোগ করেন, “আমি যদি বিশ্বকাপে চার-পাঁচটি গোল করি এবং ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়, তাহলে পুরো গল্পটাই বদলে যাবে। তখন সবাই বলবে, আমি আসলে বিশ্বকাপের জন্যই নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম।”

ব্রাজিলবাসীর ভালোবাসা কি জয় করতে পারবেন তিনি?

ব্রাজিলের জার্সিতে ভিনিসিয়ুসের পথ কখনও মসৃণ ছিল না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্রাজিলের এক সাবেক কোচ বিবিসিকে জানান—ভিনিসিয়ুসের মধ্যে একটি প্রবল মানসিক চাপ কাজ করে। “সে সবসময় ম্যাচের প্রধান চরিত্র হতে চায়। আর সেই আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় তাকে অতিরিক্ত চাপে ফেলে।”

অবশ্য ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময়ই তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। দ্বিতীয় বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া এই ফরোয়ার্ড বর্তমানে ১৪টি বাণিজ্যিক চুক্তির সঙ্গে যুক্ত—যা অন্য যে কোনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের চেয়ে বেশি। তবু মাঠের বাইরের জনপ্রিয়তা তাকে এখনো এনে দিতে পারেনি সেই আবেগঘন গ্রহণযোগ্যতা, যা নেইমার এখনও ব্রাজিলের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে উপভোগ করেন।

এ যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য

একজন তারকার সেরা সময় হয়তো পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ভালোবাসা অটুট। আরেকজন নিজের ক্যারিয়ারের শিখরে অবস্থান করেও এখনও সেই একই মমতা ও গ্রহণযোগ্যতার অপেক্ষায়।

ক্রীড়া বিপণন বিশেষজ্ঞ এদুয়ার্দো মুসা বলেন, “ভিনিসিয়ুসকে ব্রাজিলিয়ানরা অবশ্যই ভালোবাসে। কিন্তু নেইমারের পর্যায়ে নয়।নেইমারের একটি সুস্পষ্ট উত্তরাধিকার রয়েছে। তিনি জাতীয় দলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। অন্যদিকে ভিনিসিয়ুস এখনও ব্রাজিলের হয়ে সেই মাত্রার অবদান রাখতে পারেননি, যেটা তিনি রিয়াল মাদ্রিদে নিয়মিত করেন।”

তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরে বলেন, “নেইমার ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সান্তোসে খেলেছেন। ব্রাজিলিয়ানরা প্রতি সপ্তাহে তাকে দেখেছে, তার উত্থানের সাক্ষী হয়েছে। ভিনিসিয়ুস খুব অল্প বয়সেই ইউরোপে চলে যান। ফ্লামেঙ্গোয় খেললেও তখন তিনি নিশ্চিতভাবে প্রথম একাদশের সদস্য ছিলেন না। ফলে দেশবাসী তার বিকাশের পুরো গল্পটা কাছ থেকে দেখতে পারেনি।”

‘এখন সবাই আমাকে নিয়েই কথা বলে’

গত কয়েক বছর ধরে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) ভিনিসিয়ুসকে জাতীয় দলের কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।

মার্চে রদ্রিগোর গুরুতর চোটের পর তাকে বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি দেওয়া হয়। ফ্রান্স ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনেও তাকে সামনে আনা হয়েছিল—দুই বছরের মধ্যে যা প্রথম।

বার্তাটা ছিল স্পষ্ট: ব্রাজিলের নতুন মুখ হবেন ভিনিসিয়ুস। তবে নেইমারের অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তনের পর ১০ নম্বর জার্সিটি আবার ফিরে গেছে তার কাছেই। তবু বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোর চোট-আঘাত নেইমারকে আগের অবস্থানে রাখেনি। ফলে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় আশা এখন অনেকের চোখেই ভিনিসিয়ুস।

ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপার সন্ধানে নামা ব্রাজিলের সামনে তাই আরেকটি বড় প্রশ্ন— এই বিশ্বকাপ কি ভিনিসিয়ুসের নিজের বিশ্বকাপ হয়ে উঠবে? ভিনিসিয়ুস নিজেও প্রস্তুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে।

“এখন সবাই আমাকে নিয়ে কথা বলে,” আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন তিনি।

“রিয়াল মাদ্রিদে টানা পাঁচ-ছয়টি ভালো মৌসুম কাটিয়েছি। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে বছরের পর বছর আছি। তাই স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্বও বেড়েছে। আর আমি সেই দায়িত্ব নিতে চাই। কারণ আমি জানি, আমার আরও দেওয়ার আছে। আরও উন্নতি করার আছে। আমি জানি আমি কোথায় পৌঁছাতে পারি। কারণ আমার সম্ভাবনার সীমা আমি কখনও নিচু করে দেখি না।” সূত্র: বিবিসি

ক্রিফোস্পোর্টস/৫জুন২৬/এজে

Crifosports announcement

Focus

More in ফুটবল