
দুয়ারে কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি মহাসমারোহে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। এর আগে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কী কী করবেন এমন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বড় বড় দলের নেতৃবৃন্দ। ধারণা করা হচ্ছে এবারের নির্বাচনে মূল লড়াইটা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। দুটি প্রধান দলই প্রকাশ করেছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার। যেখানে দুদলই গুরুত্ব দিয়েছে খেলাধুলাকে।
গত শুক্রবার ইশতেহার ঘোষণা করে বিএনপি। যেখানে ৯ প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে রাখা হয়েছে খেলাধুলার সম্প্রসার ও উন্নয়নকে। আর জামায়াতে ইসলামী খেলাধুলার উন্নয়নে তাদের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে ইশতেহারে। সেখানে রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বও। দুই দলই ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিএনপির ইশতেহারের খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার করেছেন তারেক রহমান। জাতীয় শিক্ষাক্রমে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস কর্মসূচির মাধ্যমে ১২ থেকে ১৪ বছরের প্রতিভাবান ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করার কথা বলা হয়েছে। ৪৫০টি উপজেলায় মানসম্পন্ন ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ, ৬৪ জেলায় ইনডোর সুবিধাসম্পন্ন স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ, দেশের সব উপজেলায় ক্রীড়া অফিসার ও ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে বিষয়ভিত্তিক ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগের কথা বলেছেন তিনি।
প্রত্যেকটি বিভাগীয় শহরে বিকেএসপির শাখা প্রতিষ্ঠা, সব মহানগরসহ দেশের গ্রামীণ জনপদে খেলার মাঠের সুব্যবস্থা করার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও সুবিধা বঞ্চিতদের খেলার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি আছে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে। এছাড়া দেশে ক্রীড়া সরঞ্জাম ইন্ডাস্ট্রি স্থাপনের ইচ্ছের কথা বলা হয়েছে।
বিএনপির ইশতেহারে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতিতে ঠাঁই পেয়েছে ক্রীড়া। ৬ নম্বর প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে। পূর্ণাঙ্গ ইশতেহারে মোট ১০টি পয়েন্ট করে খেলাধুলা উন্নয়নে নিজেদের ভাবনার কথা তুলে ধরেছে বিএনপি।
ওয়ার্ড-ভিত্তিক মাঠ তৈরি ও মাঠ দখলমুক্তকরণ
ঢাকা শহরে ওয়ার্ড/থানা-ভিত্তিক খেলার মাঠ তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হবে। সম্ভব হলে দুটি ওয়ার্ডের মাঝে একটি মাঠ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। বেদখল হওয়া খেলার মাঠগুলোকে পুনরুদ্ধার করা হবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুদৃঢ় অবস্থান তৈরিতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ
২০৩০ সালের মধ্যে খেলাধুলার কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ যাতে একটি গ্রহণযোগ্য স্থান করে নিতে পারে সে লক্ষ্যে পরিকল্পিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। মাল্টি গেমস ইভেন্ট যেমন সাউথ এশিয়ান গেমস, এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস, অলিম্পিক গেমস ইত্যাদিতে বাংলাদেশের সম্মানজনক স্থান অর্জনের জন্য দেশে একটি আধুনিক জাতীয় অলিম্পিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হবে।
ট্যালেন্ট হান্ট স্কিম প্রচলন
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রীড়ার ক্ষেত্রে ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ স্কিম চালু করা হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদদের সম্মানজনক জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হবে।
নারী ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিকরণ
ক্রীড়াঙ্গনে নারী ক্রীড়াবিদদের হয়রানি নিরসন এবং তাদের জন্য সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা প্রদানের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
ক্রীড়াঙ্গনে দলীয় হস্তক্ষেপ বন্ধকরণ
ক্রীড়াঙ্গন ও ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঠিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাকল্পে দলীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হবে।
ক্রীড়ার অন্যান্য খাতে পেশাদার লিগ চালুকরণ
ক্রিকেট ও ফুটবলের পাশাপাশি হকি, বাস্কেটবল, ভলিবল, দাবা ও অন্যান্য খেলায়ও পেশাদার লিগ চালু করা হবে।
জাতীয় স্পোর্টস রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা
একটি জাতীয় স্পোর্টস রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হবে যা বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং ডাটা বিশ্লেষণ ব্যবহার করে খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
স্পোর্টস ইকোনমিকে সম্প্রসারণ
‘স্পোর্টস ইকোনমি’-কে সম্প্রসারণ ও উৎসাহ প্রদান করা হবে। ক্রীড়াঙ্গন যাতে দেশের অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করতে পারে সে লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসিকে গুরুত্বারোপ
খেলাধুলার মানোন্নয়নের জন্য ক্রীড়ায় অগ্রবর্তী দেশ/আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং পিপল-টু-পিপল সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’-কে গুরুত্বারোপ করা হবে। দেশে আধুনিক ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।
মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে, খেলোয়াড়দের জন্য ভাতা, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং একটি আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আগামী ৫ বছরে ৫০০ আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কাবাডি, কুস্তি ও নৌকাবাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় ক্রীড়া ব্যবস্থার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করা হবে।
৯০ পৃষ্ঠার ইশতেহারের সপ্তম ভাগের যুব ও ক্রীড়া অধ্যায়ে ১০টি পয়েন্টে ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছে জামায়াত। এছাড়া অষ্টম ভাগের নিরাপদ নারী ও শিশু অংশে নারীর স্বাস্থ্য ও খেলাধুলায় গুরুত্ব আরোপের কথা বলা হয়েছে।
ক্রীড়াতে শিশু/কিশোর, যুবক/যুবতীদের সর্বজনীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি সুস্থ-সবল জাতি গঠনের জন্য সামাজিক আন্দোলনের রূপ দেওয়ার কথা বলেছে জামায়াত।
৫ বছরে ৫০০ আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরির লক্ষ্যে খেলোয়াড় নির্বাচিত হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে। এর জন্য প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের মাসিক বৃত্তি, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণে সহায়তা এবং স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা ও স্পন্সরশিপ সংগ্রহে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সরকারি উদ্যোগে ৫ বছরে ৫০ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে তরুণদের জন্য আর্থিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২ বছরের জন্য শিক্ষিত বেকারদের কর্জে হাসানা (সুদমুক্ত ঋণ) হিসেবে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে ‘দক্ষতা বহুমুখীকরণ ফি’ প্রদান করা হবে।
জামায়াত ক্ষমতায় এলে ‘যোগ্যরাই সরকারি চাকরিতে, বয়স কোনো বাঁধা নয়’— এই নীতির অনুসরণ করা হবে ক্রীড়াক্ষেত্রেও। সুস্থ-সবল তরুণ ও যুবসমাজ গড়ে তোলার জন্য মহল্লাভিত্তিক ব্যায়ামাগার, খেলার মাঠ ও সুইমিং পুলের ব্যবস্থা করা হবে। এ ব্যাপারে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হবে।
অলিম্পিকসহ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টগুলোতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে তাদের ইশতেহারে। জাতীয় পর্যায়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তুলে আনার জন্য প্রতিবছর দেশব্যাপী ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ কর্মসূচি আয়োজন করা হবে।
ক্রীড়াঙ্গনকে সিন্ডিকেট ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করে দক্ষ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা হবে। দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাকে (হা-ডু-ডু, কুস্তি, নৌকা বাইচ ইত্যাদি) রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করা হবে।
জামায়াতে ইশতেহারে মানসিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও ক্যানসার সচেতনতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
ক্রিফোস্পোর্টস/৮ফেব্রুয়ারি২৬/এজে





























