
বিশ্বকাপের মতো বড় ইভেন্ট মাঠে গড়িয়েছে। কিন্তু নেই কোনো আমেজ। বাংলাদেশ বয়কট করায় জৌলুস হারিয়েছে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। নিরুত্তাপ এই আসরের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল-আইসিসির একপেশে আচরণ ও ভারতের দাদাগিরি।
আইসিসি বিশ্ব ক্রিকেট পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংস্থাটির সিদ্ধান্ত ও অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থামছেই না। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের বড় অংশের অভিযোগ—আইসিসি ক্রমেই ভারতের স্বার্থনির্ভর হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে টুর্নামেন্ট কাঠামো, আয় বণ্টন, ভেন্যু নির্বাচন এমনকি মাঠের বাইরের শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই ধারা চলতে থাকলে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
হাইব্রিড মডেল: নিরপেক্ষতার বড় ধাক্কা
দীর্ঘ ৮ বছর পর গত বছর মাঠে গড়ায় আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। পাকিস্তান ছিল ওই টুর্নামেন্টের আয়োজক। কিন্তু ভারত পাকিস্তানের মাটিতে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাদের জন্য রাখা হয় হাইব্রিড মডেল। আর এই মডেল সংযোজন আইসিসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে।

গত বছরের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে একক ভেন্যুতে খেলার সুবিধা নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত।
সবগুলো দল খেলেছিল পাকিস্তানে, সেখানে ভারত খেলেছিল আরব আমিরাতের একটি নির্দিষ্ট ভেন্যুতে। সমালোচকদের মতে, হাইব্রিড মডেল ব্যবহারে কিছু দল বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে—বিশেষ করে ভ্রমণ কম হওয়া, পরিচিত কন্ডিশনে খেলা এবং সমর্থকদের উপস্থিতি। এতে টুর্নামেন্টের ‘সমান সুযোগ’ নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এক বা একাধিক দলকে আলাদা দেশে ম্যাচ খেলানোর এই পদ্ধতি মূলত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত অজুহাতে চালু হলেও বাস্তবে এটি প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
টুর্নামেন্টে উগ্র আচরণ ও আইসিসির নীরবতা
বিশ্বকাপ ও বড় আইসিসি ইভেন্টগুলোতে মাঠে ও মাঠের বাইরে উগ্র আচরণের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। দর্শকদের অসংযত আচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচার এবং রাজনৈতিক স্লোগান ক্রিকেটের পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় আইসিসি অনেক সময় কঠোর অবস্থান নেয় না। বিশেষ করে প্রভাবশালী দেশের সমর্থকদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে ক্রিকেট বিশ্বে।

ভারতীয় ক্রিকেটারদের উদযাপনে থাকে এক ধরণের আগ্রাসন।
ভারতের আধিপত্য ও আইসিসির নমনীয়তা
বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনীতিতে ভারতের আধিপত্যই আইসিসির এই নমনীয়তার মূল কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপন আয়ের বড় অংশ আসে ভারতীয় বাজার থেকে। ফলে আইসিসির রাজস্ব কাঠামোতে বিসিসিআই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে।
এই প্রভাবের কারণে ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগ- আইপিএলের সময়সূচিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ঊর্ধ্বে রাখা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলে এই লিগ। আইপিএলের সময়ে অন্যান্য কোনো টুর্নামেন্ট বা সিরিজ না রাখা একবারেই একচোখা নীতি।
এছাড়াও বড় সিদ্ধান্তে ভারতের মতামত অগ্রাধিকার পায়। অন্য দেশগুলো একই অবস্থান নিলে ভিন্ন নীতির মুখে পড়ে। যেমন- এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ইস্যু। ভারতে বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে মারার বহু ঘটনা ঘটেছে, মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলের দল থেকে বোর্ডের নির্দেশে বাদ দেওয়ার ঘটনার পর বাংলাদেশ নিরাপত্তা শঙ্কায় পড়ে।

গত বছরের আইসিসির বার্ষিক কনফারেন্স।
সে কারণে ভারতের মাটিতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় এবং শ্রীলঙ্কার মাটিতে খেলার প্রস্তাব দেয়। এর আগে ভারত পাকিস্তানে যেতে না চাওয়ায় তাদের দুবাইতে খেলার অনুমতি দিয়েছিল আইসিসি। কিন্তু এবার বাংলাদেশের বেলায় সেটা মানলো না। যা স্পষ্টতই দ্বিচারিতা।
এতে আইসিসি ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক সংস্থা নয়, বরং প্রভাবশালী একটি বোর্ডের সঙ্গে আপস করা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠছে।
ছোট দেশগুলোর জন্য বাড়ছে অস্তিত্ব সংকট
আইসিসির এই নীতিগত ঝোঁকের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে ছোট ও উদীয়মান ক্রিকেট দেশগুলোর। পর্যাপ্ত ম্যাচ না পাওয়া, কম আর্থিক বরাদ্দ এবং বড় টুর্নামেন্টে সীমিত সুযোগ তাদের ক্রিকেট কাঠামো দুর্বল করে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এতে ক্রিকেট বৈশ্বিক খেলাধুলা হিসেবে তার বিস্তার হারাতে পারে।
ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কী করা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রিকেটকে টিকিয়ে রাখতে হলে আইসিসিকে— হাইব্রিড মডেলের ব্যবহার সীমিত ও স্বচ্ছ করতে হবে। টুর্নামেন্টে উগ্র আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর ও সমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাজস্ব বণ্টনে ছোট দেশগুলোর অংশ বাড়াতে হবে এবং রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ক্রিফোস্পোর্টস/৮ফেব্রুয়ারি২৬/এজে


























